অভিষেকেই ৫ উইকেট, জাতীয় লিগে রূপকথার জন্ম দিলেন তরুণ
- আপডেট সময় : ০৮:০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
কপাল খুললে হয়তো ওমানে আফগানিস্তানের বিপক্ষে যুব দলের সিরিজেই খেলতে দেখা যেত রাকিব হাওলাদারকে। ভাগ্যটা একটু ভালো হলে রাকিব হাওলাদার এখন থাকতে পারতেন ওমানে।
গত এপ্রিল মাসে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ৪ ইনিংস বল করে ১৩টি উইকেট শিকার করেছিলেন এই বাঁহাতি স্পিনার। তার পারফরম্যান্সের সুবাদে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে ডাকও পেয়েছিলেন। তবে চূড়ান্ত দলে সুযোগ মেলেনি, যা কিশোর বয়সের রাকিবের জন্য ছিল বড় এক ধাক্কা। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের নিয়মিত সিঁড়িগুলো পেরিয়ে না এলে যে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তা তিনি বেশ ভালোভাবেই জানতেন। কিন্তু বিধাতা তাঁর জন্য লিখে রেখেছিলেন ভিন্ন এক অধ্যায়। গত এপ্রিলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ৪ ইনিংসে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের রেলগাড়িতে চলতে না পারলে দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে হয়। বড়দের ক্রিকেটের কোনো সংস্করণেও পা পড়েনি।
সতীর্থরা যখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জার্সিতে ব্যস্ত, রাকিব তখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিলেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগে চট্টগ্রামের বিপক্ষে খুলনা দলের একাদশে শুরুতে ছিলেন না তিনি। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে গিয়ে খুলনা দলের বাঁহাতি স্পিনার সামিউন বাসীর মাথায় বলের আঘাত পেলে। তড়িঘড়ি করে তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়। ঠিক তখনই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে রাকিবের অভিষেক নিশ্চিত হয়। তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই তখন ঘিরে ধরেছিল হতাশা। রাকিবের উত্তরে মিশে থাকে কৈশোরের সারল্য, ‘শুরুতে একটু ভয় ভয় লেগেছিল।’।
মুঠোফোনে সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রাকিব জানান, সতীর্থের মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ড্রেসিংরুমে ফেরার পরিস্থিতি দেখে তিনি কিছুটা শঙ্কিত ছিলেন। তুষার ইমরান স্যার যখন তাঁকে প্রস্তুত থাকতে বললেন, তখন কিশোর বয়সের স্বাভাবিক ভীতি কাজ করছিল। তবে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে বড় ভাইদের উৎসাহে তিনি ভয় কাটিয়ে ওঠেন। মিঠুন ও মেহেদী হাসানদের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের স্বাভাবিক বোলিংয়ে মনোযোগ দেন তিনি। কিন্তু ড্রেসিংরুমে ফেরার পর ওনার খারাপ লাগতে শুরু করে। তাঁরই কিনা একটা ম্যাচের মাঝপথে মাঠে নেমে যেতে হচ্ছে। সেই ভয়টা তাঁর কেটে গেছে সামিউনের ‘লাইক টু লাইক’ বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর। সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে ড্রেসিংরুমে বড় ভাইদের আদরটা তাঁর জন্য তখন মাঠে হয়ে গিয়েছিল সাহস, ‘মিঠুন ভাই, মেহেদী ভাইরা আমাকে বলেছিল, তুই তোর বোলিংটা করে যা।
এই রাকিবকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিয়ে আসার পেছনের কারিগর কোচ তুষার ইমরান। গত এপ্রিলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্বে থাকাকালীন রাকিবের টানা বল করার ক্ষমতা তুষারের নজর কাড়ে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই ছেলেটিতেই খুলনার বাঁহাতি স্পিনারের দীর্ঘদিনের আকাল ঘুচতে পারে। কিন্তু বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের বাইরে স্বীকৃত ক্রিকেটে পা না রাখা রাকিবকে দলে ভেড়াতে নির্বাচকদের সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট দীর্ঘ আলোচনা করতে হয়েছিল তুষারকে।
তুষারের ভাষ্যমতে, নির্বাচকদের রাজি করানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তারা চেয়েছিলেন রাকিব যেন আগে অন্য কোনো স্তরে খেলে আসে। কিন্তু তুষার নাছোড়বান্দা ছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন এখনই সুযোগ দিতে। যদিও এত দ্রুত ম্যাচে খেলানোর পরিকল্পনা তুষারেরও ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল দলের সঙ্গে রেখে পর্যায়ক্রমে তৈরি করা। কিন্তু ভাগ্য রাকিবের জন্য অন্য পথ খুলে রাখে।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষিক্ত হয়ে ৫ উইকেট পাওয়ার বিরল নজির গড়েছেন এই তরুণ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কোচ তুষার ইমরানের আস্থার প্রতিদান তিনি দিয়েছেন দারুণভাবে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনারদের যে ঐতিহ্য, রাকিবের হাত ধরে তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে—এমন স্বপ্নই এখন দেখছেন সমর্থকরা। শুধু অভিষেক বললেও ঠিকঠাক বোঝানো যায় না ঘটনাটা, অভিষেকেই তিনি পেয়ে গেছেন ৫ উইকেটও। ঘরোয়া ক্রিকেটে সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের ইতি টেনে অনেক দিন ধরেই তিনি কোচিংয়ে নাম লিখিয়েছেন।
অভিষেকের এই সাফল্য রাকিবের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। এখন তাঁর লক্ষ্য এই ছন্দ ধরে রেখে নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তরুণ স্পিনারদের অভাব নেই, তবে রাকিবের শুরুর এই নাটকীয়তা এবং পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

























