ইউক্রেনের শস্য রপ্তানিতে রাশিয়ার হামলা ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি
- আপডেট সময় : ০৩:১৪:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ যখন তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন, তখন বিশ্বজুড়ে খাদ্য শস্য সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথটিতে আবারও ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটছে।
ইউক্রেন তাদের কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য মূলত কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী এবং বিভিন্ন স্থলপথ ব্যবহার করে থাকে।
কিন্তু রাশিয়া বর্তমানে এই রুটগুলোতে ইউক্রেনের সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দিতে পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনের বন্দর, গুদাম, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষিনির্ভর অবকাঠামো এবং পণ্যবাহী জাহাজে প্রতিনিয়ত হামলা চালানো হচ্ছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি, সার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপথে পরিবহন, জ্বালানির বাজার, বাণিজ্যপ্রবাহ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ইউক্রেন ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য সরবরাহকারী। দেশটি বিশ্বের মোট ভুট্টা রপ্তানির ১৫ শতাংশ, গম রপ্তানির ১০ শতাংশ, যব রপ্তানির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেল রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ জোগান দিত। সেই ইউক্রেন এখন যুদ্ধের কারণে তাদের রপ্তানি সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দেশটির শস্য রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দেশটির শস্য রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটও এর প্রমাণ।
আগামী মাসগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অক্টোবরের মধ্যেই ইউক্রেনে কৃষিপণ্য মজুত রাখার জায়গার অভাব দেখা দিয়েছে এবং নভেম্বর নাগাদ শস্য, তৈলবীজ ও প্রক্রিয়াজাত পশুখাদ্যসহ প্রায় ৯০ লাখ টনের বেশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ফসল সময়মতো রপ্তানি না হলে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন, যার ফলে পরবর্তী মৌসুমে বীজ বপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব দেখা দেবে এবং উৎপাদন হ্রাস পাবে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার, এমতাবস্থায় এই সরবরাহ সংকট মানবিক বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে। কৃষকেরা এ মৌসুমের ফসল বিক্রি করতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে বীজ বপনের জন্য তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে না।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ তার গম ও গমজাতীয় খাবারের চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে এবং প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশ সরাসরি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। চার বছর আগে যুদ্ধের প্রভাবে যখন বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ দ্রুতই এর নেতিবাচক প্রভাব টের পেয়েছিল। সে সময় গম আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়, যা এখনো মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের এ পরিস্থিতির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত।
রাশিয়া শুরু থেকেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে খাদ্য সংকটকে যুদ্ধের একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা কেবল কিয়েভকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই নয়, বরং বিশ্ব সম্প্রদায় এই খাদ্য সংকটজনিত চাপ কতটা সহ্য করতে পারে, তা যাচাই করছে। তবে এই পরিস্থিতির শিকার কেবল ইউক্রেন নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন আমদানিনির্ভর দেশ, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো। খাদ্যের দাম ও সরবরাহে নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সবচেয়ে কম যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠীর, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
যদিও ইউক্রেন বর্তমানে স্থল ও নদীপথে বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তবে সমুদ্রপথের নিরাপদ চলাচলের কোনো বিকল্প নেই। সমুদ্রপথে অবাধ জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বেসামরিক জাহাজ এবং অবকাঠামোয় হামলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এটি কেবল শস্য রপ্তানি স্বাভাবিক করবে না, বরং কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নিশ্চয়তা প্রদান করবে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্যব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জীবনরেখা সচল করলে তার ইতিবাচক সুফল কেবল ইউরোপেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অনুভূত হবে। সমুদ্রপথে নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। এই মন্তব্যটি বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেনের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সম্মিলিত উদ্বেগের প্রতিফলন।

























