কুড়িগ্রামে বিরল সিঁদুরে মৌটুসি পাখির দেখা মেলায় বিস্ময়
- আপডেট সময় : ০১:৫৭:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে বিচরণকারী মৌটুসি প্রজাতির পাখির মধ্যে সিঁদুরে মৌটুসিকে অন্যতম সুন্দর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রজাতির পাখির উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিনের আগ্রহের কারণ। সাধারণত গভীর বনভূমি যেমন সুন্দরবন, চট্টগ্রামের হাজারিখিল অথবা হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এদের দেখা মেলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় এই পাখির খোঁজ করেও হতাশ হতে হয়েছিল পর্যবেক্ষকদের। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, উত্তরাঞ্চলে এই পাখির উপস্থিতির কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই। এ কারণে মান্দারের মৌসুম এলেই এই পাখির খোঁজ বেড়ে যেত।
তবে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বাসিন্দা আলোকচিত্রীদের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এক শীতের সকালে নিজ বাড়ির আঙিনায় সিঁদুরে মৌটুসি পাখির দেখা মেলে। শিম ফুলের মধু খাওয়ার সময় পাখিটি চোখে পড়ে, যা স্থানীয়দের জন্য ছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা। পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, কেবল রাজারহাট নয়, কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরী উপজেলার বিভিন্ন স্থানেও এই পাখির বিচরণ রয়েছে। আলোকচিত্রী সঞ্জয় চৌধুরী নাগেশ্বরীতে এই পাখির আলোকচিত্র ধারণ করেছেন, যা বনহীন জনপদে পাখিটির উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় আমার গ্রামের বাড়ি।
পাখিটি নিয়ে গবেষণার খাতিরে নানা তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।
২০১৯ সালে লেখক নিজ বাড়ির আঙিনায় গোলাপজাম ফুলে সিঁদুরে মৌটুসি স্ত্রী পাখির ছবি তুলেছিলেন, যদিও তখন পাখিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। ২০২৩ সালের পরবর্তী সময়ে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সেই ছবিটি ছিল সিঁদুরে মৌটুসি স্ত্রী পাখির। এছাড়া, ২০২৪ সালে সুন্দরবনে অত্যন্ত কাছ থেকে এই পাখিটি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই পাখি মান্দার ফুল ছাড়াও লিচুর রস সংগ্রহ করে, যা আগে খুব একটা শোনা যায়নি। লিচুর মৌসুমে ফুলঝুরি, শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলির সঙ্গে এদের লিচুর রস পান করতে দেখা গেছে। এছাড়া মধুমঞ্জরী ও জবা ফুল থেকেও এরা মধু আহরণ করে থাকে। ছবির বাইরে বাস্তবে এই পাখি দেখার প্রবল ইচ্ছা ছিল। যাঁরা পাখির খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের অনেকে বলেছিলেন, রংপুরের কোথাও এই পাখি দেখা যায় না। এসব শুনে রংপুরে এই পাখি খোঁজা ছেড়ে দিয়েছিলাম। খাওয়া ছেড়ে দ্রুত ক্যামেরা বের করে ছবি তুললাম। ভালো ছবি না পেলেও কুড়িগ্রামে এই পাখি দেখাটাই একটি বড় ঘটনা হয়ে থাকল। যেহেতু এই পাখি একবার দেখা গেছে, তাই যতবার বাড়িতে যাই, আমি এই পাখি খুঁজি। ফুলঝুরি, শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলি পাখি বারবার এসে লিচু খাচ্ছিল। ছবি তুলতে তুলতে দেখি, রং ছড়িয়ে চলে এল সিঁদুরে মৌটুসি। এ পাখি যে লিচুর রস খায়, এটি কোনো দিন শুনিনি, কারও ছবিতেও দেখিনি। তা ছাড়া তখন এ পাখি ভালোভাবে চিনতাম না। তবে লিচুর সঙ্গে কিংবা গোলাপজাম ফুলের সঙ্গে যেভাবে এই পাখি দেখেছি, তা মন ভরে ওঠার জন্য যথেষ্ট।
সিঁদুরে মৌটুসি বা ‘ক্রিমসন সানবার্ড’ (বৈজ্ঞানিক নাম: Aethopyga siparaja) শারীরিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অন্য মৌটুসিদের চেয়ে কিছুটা বড়। এর মাথা, গলা ও আশপাশের অংশ সিঁদুরের মতো টকটকে লাল এবং কপাল ও চোখ কালো রঙের হয়। এদের চঞ্চু লাল আভা যুক্ত এবং চঞ্চুর গোড়া থেকে একটি কালো রেখা লাল রঙের ওপর দিয়ে গলার দিকে বিস্তৃত। মধু সংগ্রহের জন্য এদের লম্বা জিভ রয়েছে, আর দেহের বাকি অংশ ধূসর। উত্তরাঞ্চলে এই পাখির উপস্থিতি বিরল হলেও, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন বাগানে বা বাড়ির আঙিনায় এখন এদের নিয়মিতই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, যা এই প্রজাতির পাখির নতুন আবাসস্থল হিসেবে অঞ্চলটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সিঁদুরে মৌটুসির ইংরেজি নাম ‘Crimson Sunbird’।

























