কেন ব্যালন ডি’অর অধরা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের কাছে
- আপডেট সময় : ০২:৫৯:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
ফুটবলের জাদুকর রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও কিংবা কাকার উত্তরসূরিদের সোনালি দিন যেন হারিয়ে গেছে। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে রোনালদো নাজারিও যখন ট্রফি তুলে দিচ্ছিলেন, তখন যেন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি অতীতের প্রতিধ্বনিই ফুটে উঠছিল। বর্তমানে ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল যেন কেবল অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে। বিশ্বসেরার সোনালি বলটাও উঠেছে তাঁদের হাতে। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে পরশু রাতের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান যেন সেই হারানো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিল। গত এপ্রিলে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোমারিও বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জিততে পারবে না।’। কথাটা তখন অনেকের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। হয়তো আগেই বুঝেছিলেন, এবার তাঁর হাতে সোনালি বল উঠছে না।
চলতি বছরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের নাম থাকলেও, চূড়ান্ত তালিকায় কারো ভাগ্যই বদলায়নি। রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এমনকি শীর্ষ দশেও জায়গা পাননি; তিনি হয়েছেন ১৭তম। এছাড়া মেয়েদের বর্ষসেরা গোলকিপারের তালিকায় পঞ্চম হয়েছেন লোরেনা, যা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের বর্তমান শূন্যতার একটি প্রতীকী চিত্র। বিশেষ করে গত মাসে ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় যখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের নাম দেখা গেল। ছেলে ও মেয়েদের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কারে শীর্ষ পাঁচেও কেউ নেই। ইউরোপের ক্লাবে খেললেও অন্য মহাদেশের কেউ বিবেচিত হতেন না। ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলারের জন্য খুলে যায় পুরস্কারের দরজা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ সালে কাকার জেতা ট্রফিটিই ছিল ব্রাজিলের শেষ ব্যালন ডি’অর জয়। গত ১৯ বছরে একবার মাত্র ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ২০২৪ সালে দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এর আগে নেইমার ২০১৫ ও ২০১৭ সালে তৃতীয় হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৯ সালে সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জিতেছিলেন আলিসন বেকার, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের কাঙ্ক্ষিত সেই মূল পুরস্কার অধরাই রয়ে গেছে। ভিনিসিয়ুস তো কিছুদিন আগেও অনেকের চোখে পুরস্কার জয়ের ফেবারিট ছিলেন। তারপর কেটে গেছে ১৯ বছর। ১১ বছর পর ২০১৮ সালে সেই আধিপত্যে প্রথম বড় ধাক্কা দিলেন লুকা মদরিচ। কিন্তু প্রতিভা আর তাঁর পূর্ণ বিকাশ তো এক জিনিস নয়। মাঠের পারফরম্যান্সে দুই মহাতারকার পেছনেই থেকে গেছেন নেইমার।
১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর শুধু ইউরোপীয়দের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তনের পর ব্রাজিলিয়ানরা আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মাত্র চারবার শীর্ষ তিনে কোনো ব্রাজিলিয়ান ছিলেন না, এবং সেই সময় পাঁচবার ব্যালন ডি’অর গেছে সেলেসাওদের ঘরে। এরপর মেসি ও রোনালদোর দীর্ঘ রাজত্ব শুরু হলেও, ব্রাজিলের সেই উৎপাদন ক্ষমতা যেন একপ্রকার থেমে গেছে। বড় পর্দায় দেখানো হলো রোনালদোর বর্ণাঢ্য অতীত। শেষবার কোনো ব্রাজিলিয়ানের হাতে উঠেছিল ২০০৭ সালে। বছরগুলো ২০০০, ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৬। দোষটা চাইলে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দিতে পারেন। অথচ প্রতিভার বিচারে নেইমারকে মেসি কিংবা রোনালদোর চেয়ে পিছিয়ে রাখেননি অনেকেই।
ফ্ল্যাশস্কোরের বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোসের মতে, বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার ও ফুলব্যাক তৈরির কাঠামোতে গভীর সংকট রয়েছে।
তিনি মনে করেন, ফুটবলার গড়ার মূল ভিত্তি ঢেলে সাজানো ছাড়া বিশ্বসেরা পর্যায়ে আবারও আধিপত্য বিস্তার করা কঠিন।
সিবিএফ-এর কোচ রজার মাচাদোও আন্তর্জাতিক ফুটবলের তুমুল প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও পর্তুগালের মতো দেশগুলো এখন কুশলী খেলোয়াড় তৈরিতে এগিয়ে গেছে।
কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও ব্রাজিলের বর্তমান ফুটবল কাঠামো নিয়ে বেশ হতাশ। তিনি বলেন, ১৫ বা ২০ বছর আগে যেভাবে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ ছিল, এখন আর সেই পরিবেশ নেই। তাঁর মতে, রাস্তার ফুটবল বা স্ট্রিট ফুটবল হারিয়ে যাওয়ায় তরুণদের সহজাত সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে। আধুনিক ফুটবলের অতিমাত্রায় শারীরিক সক্ষমতা ও গতির ওপর গুরুত্ব দেওয়াটাও এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। সঞ্চালক ও ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির সে কী উচ্ছ্বাস। ব্রাজিলের ফুটবলে কত জল গড়িয়েছে, কত প্রতিভা এসেছে, হারিয়েও গেছে।
রোমারিও আরও সতর্ক করে বলেছেন, শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ব্রাজিলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নেইমার বা ভিনিসিয়ুসের কাঁধে পুরো দলের দায়িত্ব চাপানোয় দলের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বর্তমানে ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জয়ী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বসেরা ফুটবলার তৈরিতে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা পর্তুগালের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। গোলকিপারদের পুরস্কারেও একই দশা হতো, রক্ষা করেছেন ব্রাজিল নারী দলের গোলকিপার লোরেনা।
একসময় ব্রাজিলিয়ানদের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ থাকত পুরো পৃথিবী। আজ সেই চিত্র বদলেছে। ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসের পাতায় আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স আটবার করে এই ট্রফি জিতেছে। অথচ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এখন মাত্র পাঁচটি ব্যালন ডি’অর নিয়ে ইতালির মতো দেশের সঙ্গে সমানে সমান অবস্থানে রয়েছে। এখন আর নতুন কোনো ফুটবল জাদুকর উঠে আসার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব, তবে তা কতটা দীর্ঘ হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।


























