ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে দিশেহারা দরিদ্র পরিবারগুলো
- আপডেট সময় : ০৩:৫৪:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা নিম্ন আয়ের রোগীদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ২ হাজার ৬০০ শয্যার বিপরীতে সবসময় ৪ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। রোগীর अत्यधिक চাপ ও দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার কারণে অনেক সময় রোগীকে বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিনা মূল্যে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় একটি অংশ সরবরাহ করার দাবি করেছে। বাবা–মা প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। গত রোববার থেকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রেখে ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে। তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়নে। বাকি সন্তানদের নানির কাছে রেখে তিনি ও তাঁর স্বামী হাসপাতালে এসেছেন। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে ৪২ শতাংশ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। মেয়ের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি। এরপরও বেশির ভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে রোগীকে সরবরাহ করা হয়, যথেষ্ট পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার মেয়েটা যে কী সুন্দর। কেউ যদি আমার মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিত, আমি তাঁদের বাসায় দাসি হয়ে থাকতাম!’।
মানিকগঞ্জের তমা আক্তারের কিডনি জটিলতা শনাক্ত হওয়ার পর গত ১৩ অক্টোবর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তিনি জানান, চার সন্তানের মধ্যে তমা সবার বড়।
তার রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিকের চেয়ে ২২ গুণ বেশি। মা লিপি আক্তার জানান, ঋণ শোধ করার জন্য পাঁচ মাস আগে ভিটেমাটির অংশটুকু বিক্রি করতে হয়েছে। এখন মেয়ের চিকিৎসার জন্য অন্যের সাহায্য ও চড়া সুদে ঋণ করে গত এক মাসে ৭২ হাজার টাকা খরচ করেছেন তমার বাবা তরফ আলী। মেয়ের সুস্থতার আশায় তারা হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে পাটি পেতে দিন কাটাচ্ছেন। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তমার মা লিপি আক্তারকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তমার বাবা তরফ আলী আসেন হাতে রক্ত পরীক্ষার ৩৫০ টাকার একটি স্লিপ নিয়ে। তমার বাবা তরফ আলী বলেন, মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রথম দিনই সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। ৬ অক্টোবর ঢাকায় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১২ হাজার টাকায় এমআরআই করান। মা লিপি আক্তার বলেন, গ্রামে তাঁর স্বামীর কোনো ভিটেমাটিও নেই।
একই রকম চিত্র পাওয়া যায় বার্ন ইউনিটেও। পটুয়াখালীর জেলে জুয়েল সরদার ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে ডান পা মারাত্মক জখম হওয়ার পর চার মাস ধরে হাসপাতালে আছেন। চিকিৎসা বাবদ এ পর্যন্ত তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার। এর মধ্যে আড়াই লাখ টাকাই চড়া সুদে নেওয়া, যা এক বছর পর সুদসহ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় দাঁড়াবে। হাসপাতালের বারান্দায় থাকা জুয়েলের স্ত্রী শাহানা জানান, এক সময় দিনে ১৫টি ওষুধ লাগত যার বড় অংশই বাইরে থেকে কিনতে হতো, তবে এখন ওষুধের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের বাসিন্দা কাজল রানী অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যাওয়া কাজল রানীর বেকার স্বামীর পক্ষে চিকিৎসার খরচ জোগানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহে ৯টি পরীক্ষা ও ওষুধ কেনা বাবদ তার ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। একইভাবে নড়াইলের চার বছরের তাহমিদ গত বছর চুলায় পড়ে গিয়ে গুরুতর দগ্ধ হয়। তার বাবার পেশা অফিস সহকারী হওয়ায় চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের পরিবারকে। এর আগে সকালে ৪০০ টাকার আরেকটি পরীক্ষা করিয়েছেন। ঋণ শোধের পর ১৫–২০ হাজার টাকা হাতে ছিল, সেই টাকাও মেয়ের চিকিৎসায় খরচ করে ফেলেছেন। নিজেদের খরচ কমাতে সকালে দুজন দুটো রুটি আর দুপুরে শুধু ডাল–ভাত খান।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর তমার পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে ঢাকায় আনা হয়। বর্তমানে আইসিইউতে তার ডায়ালাইসিস চলছে। পরিচালক এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, রোগীর সেবায় বাজেট বাড়ানোর কাজ চলছে যাতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে খরচ কমে। তবে বাস্তবে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের জন্য বাইরে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তমাকে ৩১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দ অত্যন্ত কম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন মো. হারুনুর রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয় বলে রোগীদের পুষ্টিকর খাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ অনেক বেড়ে যায়, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

























