ঢাকা ১০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি: গাণিতিক সুরক্ষা কি প্রান্তিক মানুষকে অদৃশ্য করে?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং তথ্যের স্বচ্ছতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আধুনিক প্রযুক্তির একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা সুরক্ষার গাণিতিক পদ্ধতিটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই ব্যাপারটার একটা কেতাবি নাম আছে—ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি। বিশেষ করে হাজারেরও কম জনসংখ্যার গ্রুপগুলোতে।

২০০৬ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী সিনথিয়া ডোয়ার্ক প্রথম এই ধারণাটি গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করেন। এর মূল কৌশল হলো, ডেটাসেটের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে এলোমেলো বা র‍্যান্ডম সংখ্যা যোগ করে দেওয়া, যাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত রেকর্ড বা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হয়। কারণ, তাদের জনসংখ্যা কম হওয়ায় তা বেঁধে দেওয়া সীমার নিচে পড়ে গেছে।

তাত্ত্বিকভাবে এটি অসাধারণ মনে হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এর গুরুতর প্রভাব রয়েছে। একটি এলাকায় কোনো বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যদি খুব কম হয়, তবে এই গোপনীয়তা সুরক্ষা ব্যবস্থা সেই সংখ্যাকে এমনভাবে বিকৃত করতে পারে যে তা বাস্তবতার সাথে মেলে না। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ৫ জন হলে, এই পদ্ধতিতে নয়েজ যোগ করার পর তা পরিবর্তিত হয়ে ২ বা ৯-এ রূপ নিতে পারে। ছোট জনবসতির ক্ষেত্রে এই গাণিতিক বিকৃতি বা বায়াস অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো এক জেলায় বছরে মাত্র সাত-আটজন রোগী বিরল কোনো এক জটিলতায় ধরা পড়ছে। সংখ্যাটা খুব ছোট, কিন্তু ওই সাত-আটজন মানুষের জন্য এটাই তাঁদের পুরো বাস্তবতা। ডেটাবেজ তখনো ঠিকই ‘গোপনীয়’ থাকে, কিন্তু ওই জেলার রোগীরা যেন কাগজে-কলমে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। হেডফোনে নয়েজ ক্যানসেলিং প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে। অর্থাৎ নয়েজ সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করলেও তার প্রভাব কিন্তু সব জায়গায় সমান নয়। কম্পিউটারের ক্যাবলের মাথায় প্লাস্টিকের মোটা অংশ থাকে কেন। তার ফলাফল ছিল ঠিক এই নমুনারই একটি বাস্তব সংস্করণ।

মেশিন লার্নিং মডেলের ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রমাণ মিলেছে ২০১৯ সালে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষক ইউজিন বাগদাসারিয়ান ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে, ডেটাসেটে অধিক উপস্থিত থাকা তথ্যের (যেমন একটি সংখ্যার চিত্র) ক্ষেত্রে মডেল ৯৮-৯৯ শতাংশ সঠিক হলেও, বিরল নমুনার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। যেসব ছবির নমুনা কম ছিল, সাধারণ মডেল যেখানে ৯৭ শতাংশ নির্ভুল ছিল, সেখানে প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি মাত্র ৭৭ শতাংশ নির্ভুলতা দেখাতে পেরেছিল। তাঁরা ছবি চেনার দুটি মডেল তৈরি করেন। কিন্তু যে সংখ্যার ছবি কম ছিল (যেমন ‘৮’-এর মাত্র ৫০০টি নমুনা), সাধারণ মডেল সেটা ৯৭ শতাংশ নির্ভুলতায় চিনতে পারলেও প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি চিনতে পেরেছিল মাত্র ৭৭ শতাংশ। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হলো, কেউ কিন্তু ইচ্ছা করে এই বৈষম্য বা পক্ষপাত তৈরি করেনি।

এটি কেবল ল্যাবরেটরির কোনো পরীক্ষা নয়, বরং ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারিতে প্রথমবারের মতো ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি প্রয়োগ করা হয়।

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জে টি মিউলার এবং পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির আলেকজান্ডার আর সান্তোস-লোজাদার ২০২২ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, বড় এলাকাগুলোর জনমিতিক তথ্য সঠিক থাকলেও, গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি তৈরি হয়েছে।

এমনকি কোভিড-১৯-এর মতো জরুরি পরিস্থিতির মৃত্যুহার গণনায়ও এই পদ্ধতি মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে।

২০২১ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক মৃত্যুহার ১০০ শতাংশের বেশি বা অস্বাভাবিক মাত্রায় দেখা গেছে, যা মূলত নয়েজ যোগ করার কুফল।

গবেষকদের মতে, শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই বিকৃতি অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ২০২৩ সালের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, মার্কিন আদিবাসী ও আলাস্কা নেটিভদের প্রায় ৮০ শতাংশ উপজাতি গোষ্ঠী আগের তুলনায় অনেক কম নির্ভুল তথ্য পাচ্ছে। এই সমস্যাটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈষম্য নয়, বরং গণিতের সীমাবদ্ধতা। যে গ্রুপে মানুষ কম থাকে, সেখানে নয়েজের আপেক্ষিক প্রভাব সব সময় বেশি হয়। এই নয়েজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্যারামিটার। মিনিয়াপোলিস ফেডারেল রিজার্ভের সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান কান্ট্রি ডেভেলপমেন্টের ২০২৩ সালের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মার্কিন আদিবাসী ও আলাস্কা নেটিভ এলাকাগুলোর মধ্যে যেসব উপজাতি গোষ্ঠী আগে বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক সম্পূর্ণ তথ্য পেত, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নতুন নিয়মে আর সেই। তাঁদের হিসাবমতে, কাউন্টি পর্যায়ের প্রায় ৪০ শতাংশ বয়স-লিঙ্গ গ্রুপ এবং ৬০ শতাংশ জাতিগত গ্রুপ এই মারাত্মক বিকৃতির শিকার হতে পারে। সান্তোস-লোজাদা, হাওয়ার্ড ও ভার্ডেরির ২০২০ সালের আরেকটি গবেষণা আরও নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছে, এই বিকৃতি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মৃত্যুহারের হিসাবে বেশি প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশেও জনস্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে এই গাণিতিক ঝুঁকির সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল ভয়াবহ, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৭০৫ জন। যদি ভবিষ্যতে এমন ছোট ও আঞ্চলিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য তথ্যে শক্তিশালী প্রাইভেসি সুরক্ষা ব্যবহার করা হয়, তবে গবেষণায় বড় ধরনের ভুল বা অদৃশ্য হওয়া রোগীদের হিসাবের ঝুঁকি থেকে যায়। একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেজ কল্পনা করুন। আর গত এক দশকে এটা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ডেটা, আদমশুমারি, এমনকি বড় বড় এআই মডেল প্রশিক্ষণেও ব্যবহৃত হচ্ছে। হুবহু একই জিনিস ঘটেছে স্বাস্থ্যের হিসাবের ক্ষেত্রেও।

ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি ও পরিসংখ্যানগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা

  1. Bagdasaryan, E., Poursaeed, O., & Shmatikov, V. (2019). Differential Privacy Has Disparate Impact on Model Accuracy.
  2. Mueller, J. T., & Santos-Lozada, A. R. (2022). The 2020 US Census Differential Privacy Method Introduces Disproportionate Discrepancies for Rural and Non-White Populations.
  3. Hauer, M. E., & Santos-Lozada, A. R. (2021). Differential Privacy in the 2020 Census Will Distort COVID-19 Rates.
  4. Santos-Lozada, A. R., Howard, J. T., & Verdery, A. M. (2020). How Differential Privacy Will Affect Our Understanding of Health Disparities in the United States.
  5. Gregg, M., Trostle, H., & Liebler, C. A. (2023). New 2020 Census Rules Make It Harder to Navigate Native American Data.

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

  • Bhowmik, K. K., et al. (2023). Recent outbreak of dengue in Bangladesh: A threat to public health. Health Science Reports, 6(4), e1210.
  • Araf, Y., et al. (2024). Emerging health implications of climate change: dengue outbreaks and beyond in Bangladesh. The Lancet Microbe, 5(3), e213.
  • এজেন্টিক এআই ও চিকিৎসাবিজ্ঞান: চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার নতুন চ্যালেঞ্জ।

পরিশেষে, মানুষকে সুরক্ষিত রাখার এই পদ্ধতি তখনই ন্যায্য যখন আমরা সচেতন থাকি যে পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই বাস্তবের মানুষ লুকিয়ে থাকে। গোপনীয়তা রক্ষার নামে প্রান্তিক মানুষদের তথ্য থেকে হারিয়ে ফেলা বা অদৃশ্য করে ফেলা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • Bagdasaryan, E., Poursaeed, O., & Shmatikov, V. (2019). Differential Privacy Has Disparate Impact on Model Accuracy. Advances in Neural Information Processing Systems (NeurIPS), 32, 15479–15488।
  • Hauer, M. E., & Santos-Lozada, A. R. (2021). Differential Privacy in the 2020 Census Will Distort COVID-19 Rates. Socius, 7।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি: গাণিতিক সুরক্ষা কি প্রান্তিক মানুষকে অদৃশ্য করে?

আপডেট সময় : ০৮:১৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং তথ্যের স্বচ্ছতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আধুনিক প্রযুক্তির একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা সুরক্ষার গাণিতিক পদ্ধতিটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই ব্যাপারটার একটা কেতাবি নাম আছে—ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি। বিশেষ করে হাজারেরও কম জনসংখ্যার গ্রুপগুলোতে।

২০০৬ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী সিনথিয়া ডোয়ার্ক প্রথম এই ধারণাটি গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করেন। এর মূল কৌশল হলো, ডেটাসেটের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে এলোমেলো বা র‍্যান্ডম সংখ্যা যোগ করে দেওয়া, যাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত রেকর্ড বা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হয়। কারণ, তাদের জনসংখ্যা কম হওয়ায় তা বেঁধে দেওয়া সীমার নিচে পড়ে গেছে।

তাত্ত্বিকভাবে এটি অসাধারণ মনে হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এর গুরুতর প্রভাব রয়েছে। একটি এলাকায় কোনো বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যদি খুব কম হয়, তবে এই গোপনীয়তা সুরক্ষা ব্যবস্থা সেই সংখ্যাকে এমনভাবে বিকৃত করতে পারে যে তা বাস্তবতার সাথে মেলে না। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ৫ জন হলে, এই পদ্ধতিতে নয়েজ যোগ করার পর তা পরিবর্তিত হয়ে ২ বা ৯-এ রূপ নিতে পারে। ছোট জনবসতির ক্ষেত্রে এই গাণিতিক বিকৃতি বা বায়াস অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো এক জেলায় বছরে মাত্র সাত-আটজন রোগী বিরল কোনো এক জটিলতায় ধরা পড়ছে। সংখ্যাটা খুব ছোট, কিন্তু ওই সাত-আটজন মানুষের জন্য এটাই তাঁদের পুরো বাস্তবতা। ডেটাবেজ তখনো ঠিকই ‘গোপনীয়’ থাকে, কিন্তু ওই জেলার রোগীরা যেন কাগজে-কলমে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। হেডফোনে নয়েজ ক্যানসেলিং প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে। অর্থাৎ নয়েজ সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করলেও তার প্রভাব কিন্তু সব জায়গায় সমান নয়। কম্পিউটারের ক্যাবলের মাথায় প্লাস্টিকের মোটা অংশ থাকে কেন। তার ফলাফল ছিল ঠিক এই নমুনারই একটি বাস্তব সংস্করণ।

মেশিন লার্নিং মডেলের ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রমাণ মিলেছে ২০১৯ সালে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষক ইউজিন বাগদাসারিয়ান ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে, ডেটাসেটে অধিক উপস্থিত থাকা তথ্যের (যেমন একটি সংখ্যার চিত্র) ক্ষেত্রে মডেল ৯৮-৯৯ শতাংশ সঠিক হলেও, বিরল নমুনার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। যেসব ছবির নমুনা কম ছিল, সাধারণ মডেল যেখানে ৯৭ শতাংশ নির্ভুল ছিল, সেখানে প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি মাত্র ৭৭ শতাংশ নির্ভুলতা দেখাতে পেরেছিল। তাঁরা ছবি চেনার দুটি মডেল তৈরি করেন। কিন্তু যে সংখ্যার ছবি কম ছিল (যেমন ‘৮’-এর মাত্র ৫০০টি নমুনা), সাধারণ মডেল সেটা ৯৭ শতাংশ নির্ভুলতায় চিনতে পারলেও প্রাইভেসি-সুরক্ষিত মডেলটি চিনতে পেরেছিল মাত্র ৭৭ শতাংশ। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হলো, কেউ কিন্তু ইচ্ছা করে এই বৈষম্য বা পক্ষপাত তৈরি করেনি।

এটি কেবল ল্যাবরেটরির কোনো পরীক্ষা নয়, বরং ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারিতে প্রথমবারের মতো ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি প্রয়োগ করা হয়।

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জে টি মিউলার এবং পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির আলেকজান্ডার আর সান্তোস-লোজাদার ২০২২ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, বড় এলাকাগুলোর জনমিতিক তথ্য সঠিক থাকলেও, গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি তৈরি হয়েছে।

এমনকি কোভিড-১৯-এর মতো জরুরি পরিস্থিতির মৃত্যুহার গণনায়ও এই পদ্ধতি মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে।

২০২১ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক মৃত্যুহার ১০০ শতাংশের বেশি বা অস্বাভাবিক মাত্রায় দেখা গেছে, যা মূলত নয়েজ যোগ করার কুফল।

গবেষকদের মতে, শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই বিকৃতি অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ২০২৩ সালের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, মার্কিন আদিবাসী ও আলাস্কা নেটিভদের প্রায় ৮০ শতাংশ উপজাতি গোষ্ঠী আগের তুলনায় অনেক কম নির্ভুল তথ্য পাচ্ছে। এই সমস্যাটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈষম্য নয়, বরং গণিতের সীমাবদ্ধতা। যে গ্রুপে মানুষ কম থাকে, সেখানে নয়েজের আপেক্ষিক প্রভাব সব সময় বেশি হয়। এই নয়েজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্যারামিটার। মিনিয়াপোলিস ফেডারেল রিজার্ভের সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান কান্ট্রি ডেভেলপমেন্টের ২০২৩ সালের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মার্কিন আদিবাসী ও আলাস্কা নেটিভ এলাকাগুলোর মধ্যে যেসব উপজাতি গোষ্ঠী আগে বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক সম্পূর্ণ তথ্য পেত, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নতুন নিয়মে আর সেই। তাঁদের হিসাবমতে, কাউন্টি পর্যায়ের প্রায় ৪০ শতাংশ বয়স-লিঙ্গ গ্রুপ এবং ৬০ শতাংশ জাতিগত গ্রুপ এই মারাত্মক বিকৃতির শিকার হতে পারে। সান্তোস-লোজাদা, হাওয়ার্ড ও ভার্ডেরির ২০২০ সালের আরেকটি গবেষণা আরও নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছে, এই বিকৃতি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মৃত্যুহারের হিসাবে বেশি প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশেও জনস্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে এই গাণিতিক ঝুঁকির সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল ভয়াবহ, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৭০৫ জন। যদি ভবিষ্যতে এমন ছোট ও আঞ্চলিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য তথ্যে শক্তিশালী প্রাইভেসি সুরক্ষা ব্যবহার করা হয়, তবে গবেষণায় বড় ধরনের ভুল বা অদৃশ্য হওয়া রোগীদের হিসাবের ঝুঁকি থেকে যায়। একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেজ কল্পনা করুন। আর গত এক দশকে এটা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ডেটা, আদমশুমারি, এমনকি বড় বড় এআই মডেল প্রশিক্ষণেও ব্যবহৃত হচ্ছে। হুবহু একই জিনিস ঘটেছে স্বাস্থ্যের হিসাবের ক্ষেত্রেও।

ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি ও পরিসংখ্যানগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা

  1. Bagdasaryan, E., Poursaeed, O., & Shmatikov, V. (2019). Differential Privacy Has Disparate Impact on Model Accuracy.
  2. Mueller, J. T., & Santos-Lozada, A. R. (2022). The 2020 US Census Differential Privacy Method Introduces Disproportionate Discrepancies for Rural and Non-White Populations.
  3. Hauer, M. E., & Santos-Lozada, A. R. (2021). Differential Privacy in the 2020 Census Will Distort COVID-19 Rates.
  4. Santos-Lozada, A. R., Howard, J. T., & Verdery, A. M. (2020). How Differential Privacy Will Affect Our Understanding of Health Disparities in the United States.
  5. Gregg, M., Trostle, H., & Liebler, C. A. (2023). New 2020 Census Rules Make It Harder to Navigate Native American Data.

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

  • Bhowmik, K. K., et al. (2023). Recent outbreak of dengue in Bangladesh: A threat to public health. Health Science Reports, 6(4), e1210.
  • Araf, Y., et al. (2024). Emerging health implications of climate change: dengue outbreaks and beyond in Bangladesh. The Lancet Microbe, 5(3), e213.
  • এজেন্টিক এআই ও চিকিৎসাবিজ্ঞান: চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার নতুন চ্যালেঞ্জ।

পরিশেষে, মানুষকে সুরক্ষিত রাখার এই পদ্ধতি তখনই ন্যায্য যখন আমরা সচেতন থাকি যে পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই বাস্তবের মানুষ লুকিয়ে থাকে। গোপনীয়তা রক্ষার নামে প্রান্তিক মানুষদের তথ্য থেকে হারিয়ে ফেলা বা অদৃশ্য করে ফেলা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • Bagdasaryan, E., Poursaeed, O., & Shmatikov, V. (2019). Differential Privacy Has Disparate Impact on Model Accuracy. Advances in Neural Information Processing Systems (NeurIPS), 32, 15479–15488।
  • Hauer, M. E., & Santos-Lozada, A. R. (2021). Differential Privacy in the 2020 Census Will Distort COVID-19 Rates. Socius, 7।