বুয়েটে তিন দিনব্যাপী রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট শেষ: ১২-দফা ঘোষণাপত্র প্রকাশ
- আপডেট সময় : ১০:৪৩:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
ন্যায্য রূপান্তরের জন্য কার্যকর জ্বালানি নীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্ভাবন, প্রযুক্তির বিকাশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তারা জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। বুধবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’ অনুষ্ঠানে আয়োজিত বিভিন্ন সেশন ও সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর
‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো বুয়েট কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এ মেলার আয়োজন করা হয়। একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি) যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করে। একই সঙ্গে সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।
১২-দফা ঘোষণাপত্র ও প্রস্তাবনাসমূহ
এবারের উৎসবের শেষ দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১২-দফা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। ঘোষণাপত্রে একটি স্বতন্ত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়ন, সৌরশক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও অ্যাগ্রিভোল্টেইক্স উন্নয়ন, স্মার্ট অবকাঠামো ও ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন এবং রেয়াতি ঋণ, গ্রিন বন্ড ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গ্রিন ফাইন্যান্স সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়। আয়োজকরা জানান, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের পাশাপাশি, এই ঘোষণাপত্রে সামাজিক ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে একটি ন্যায়সংগত, জেন্ডার-সংবেদনশীল ও কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন জ্বালানি রূপান্তরের দাবি জানানো হয়েছে; যেখানে নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে, জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক পর্যবেক্ষণ, শ্রমিকদের সুরক্ষা কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া অংশীদারিত্ব জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উদ্ভাবন মেলা ও আন্তর্জাতিক সংলাপ
সমাপনী দিনের অনুষ্ঠানে সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মেলার বিভিন্ন স্টল বিপুল উৎসাহে ঘুরে দেখেন। এ দিন প্রযুক্তি মেলায় দেশিয় উদ্ভাবকরা তাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন নতুন ধারণা প্রদর্শন করেন। পাশাপাশি কর্পোরেট খাতের প্রতিষ্ঠিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্য ও উদ্ভাবনী সেবা তুলে ধরা হয়। উৎসবের শেষ দিনের প্রথম অংশে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একাধিক উচ্চপর্যায়ের সমান্তরাল সংলাপ ও প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সেশনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত বিকশিত হতে পারে, সেই পথনির্দেশনা দেন।
তরুণদের অংশগ্রহণ ও এনডিসি ৩.০ সংলাপ
তরুণদের আয়োজনে ‘ফ্রম কমিউটমেন্ট টু কমিউনিটিঃ অ্যাডভান্সিং এ জাস্ট এনার্জি ট্রান্সজিশন থ্রু বাংলাদেশ এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। শায়লা শবনম রিচির সঞ্চালনায় এই প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বায়ুদূষণ ও ধুলাবালি কমাতে কার্যকর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মোকাবিলায় সৌরচালিত সেচব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, আগামী ১২ মাসে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা তৈরি এবং সবুজায়নে তরুণদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে আলোচকরা এ খাতে প্রযুক্তি ও উদ্যোগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। দেশিয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল শিল্পখাতগুলোয় কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়েও সেখানে জোর দেওয়া হয়।
অর্থায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা সেশন
উৎসবের শেষ দিনে ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ’ শীর্ষক আরও একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একশনএইড বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড এনগেজমেন্ট কাজী মোর্শেদ আলমের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন খান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি তানজিনা দিলশাদ, গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়াটিভের (জিজিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক একেএম নুরুননবী প্রমুখ। প্যানেল আলোচনা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো উন্নয়নে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, কার্যকর ট্যারিফ ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠান ও অংশগ্রহণকারী
অনুষ্ঠানের শেষ দিনে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ইনোভেশন, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘সোশ্যাল-ইনভায়রনমেন্টাল সেফগার্ড অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ এবং ‘এনার্জি পলিসি অ্যান্ড গভরন্যান্স ফর এ জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক পৃথক তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য এবং স্টান্ডিং কমিটি অন মিনিস্ট্রি অব ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারপার্সন জাহরাত আদিব চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বুয়েটের অধ্যাপক এমএএ শওকত চৌধুরী, একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) ও জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে আবহমান বাংলার ন্যায়সংগত জ্বালানি ভবিষ্যতের রূপচিত্র পাপেট শোর মাধ্যমে তুলে ধরে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার।

























