ফ্রান্সে শিক্ষা সংস্কারের ঘোষণা, তবু থামছে না শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
- আপডেট সময় : ০২:৩৬:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ফ্রান্স সরকার তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সরকারের এই উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিদ্যমান পদ্ধতি ঢেলে সাজানো, উচ্চশিক্ষায় ১৫ হাজার নতুন আসন তৈরি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সাপেক্ষে বৃত্তির সমন্বয় করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে এবং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপতিস্ত সরকারের এই নতুন রূপরেখা তুলে ধরেন। তবে সরকারের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তেমন কোনো স্বস্তি ফেরেনি। বৃত্তি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ফ্রান্সে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। সরকারের ঘোষণায় শিক্ষা খাতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্দোলনকারীরা সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিতর্কিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ভর্তি মানদণ্ড ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতার অভাব তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে। সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ভর্তি প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মানদণ্ড আরও স্পষ্ট করা হবে এবং আবেদনের প্রত্যাখ্যানের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে। পরবর্তীতে ২০২৮ সালে পারকুরসুপ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা থাকায় আন্দোলনকারীরা একে আপাতত সন্তোষজনক মনে করছেন না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভর্তি প্রক্রিয়ার মানদণ্ড ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে। এরপর ২০২৮ সালে বর্তমান পারকুরসুপ ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব আসন বাস্তবে চালু হলে কতজন শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর।
উচ্চশিক্ষায় আসন সংকট মোকাবিলায় সরকার আগামী দুই বছরে ১৫ হাজার নতুন আসন তৈরির অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার আসন বিটিএস, ৪ হাজার প্রযুক্তিবিষয়ক ইনস্টিটিউট এবং ১ হাজার আসন স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষায় যুক্ত হবে। বিশেষত ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে তীব্র আসন সংকটের কারণে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মানা হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এছাড়া ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পিছিয়ে পড়া এলাকার লিসেগুলোতে ক্লাসের আকার ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং দ্বিতীয় স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় ৫০০ নতুন শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। দিনের মধ্যভাগে এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নবিরতি নিশ্চিত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার আসন ব্রেভে দ্য তেকনিসিয়াঁ সুপেরিয়র (বিটিএস) পর্যায়ে, ৪ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিষয়ক ইনস্টিটিউটে এবং ১ হাজার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা হলো, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাপ্রাপ্ত অর্ধেক লিসেতে দশম শ্রেণির প্রতিটি ক্লাসে সর্বোচ্চ ২৮ জন শিক্ষার্থী রাখা। শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় দ্বিতীয় স্তরের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পিত পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অতিরিক্ত ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময়ের ক্লাসের চাপ কমাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দিনের মাঝখানে অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নবিরতি নিশ্চিত করার উদ্যোগও ঘোষণা করেছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উন্নয়নে এক বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ এবং লিসে সংস্কারে ২০৩০ সালের মধ্যে চার বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত ঋণসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের ক্ষেত্রে সবার জন্য এক ইউরোর খাবার চালুর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার ঘোষণা এসেছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাস উন্নয়ন এবং সংস্কারের লক্ষ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মতে, সরকারের এসব ঘোষণা তাদের সব দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লে মোঁদ পত্রিকার ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধি লুই লেতুবলঁ জানিয়েছেন যে, সরকারের অনেক প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও তা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। সব দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা আগামী ৩১ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারের পদক্ষেপে সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। লে মোঁদের ২৬ অক্টোবরের সরাসরি প্রতিবেদনে শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধি লুই লেতুবলঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের চাপে থাকা সরকারের জন্য এই বিশাল সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, সমান সুযোগ এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে জাতীয় বিতর্কের একটি প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সরকার ও শিক্ষার্থীদের এই বিরোধ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ফলে ঘোষণাটিকে ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

























