প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি: আইনি বাধা কাটলেও কাটছে না অনিশ্চয়তা
- আপডেট সময় : ০৮:৩৬:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘ ১৬ বছর আগে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন অনেকে। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে সেই প্রতীক্ষা ১৩ বছর ধরে ঝুলে আছে। গত জুনে আইনি জটিলতা নিরসন হলেও আদালতের রায়ের অনুলিপি হাতে পেতে লেগেছে প্রায় পাঁচ মাস। যদিও এখন প্রশাসনিক কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে, তবুও কবে নাগাদ পদোন্নতির চূড়ান্ত চিঠি হাতে পাবেন, সেই অনিশ্চয়তা কাটছে না ভুক্তভোগী শিক্ষকদের মনে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। এই সংকট দূর করতে ৩৬ হাজার ২৩৫ জন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বহীনতা দূর হবে। তবে পদোন্নতি আটকে থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা কেবল পদমর্যাদা নয়, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি তাদের। পদোন্নতি আটকে থাকায় তাঁরা শুধু পদমর্যাদা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
ডিপিই মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের সারসংক্ষেপ ও নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এখন প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত করার কাজে। দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের চাকরির নথি, সার্ভিস বুক, বদলি সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। কোনো যোগ্য শিক্ষক যেন ভুল তথ্যের কারণে তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। তবে এই যাচাই-বাছাই শেষে ঠিক কবে নাগাদ পদোন্নতির আদেশ জারি হবে, তা নিয়ে অধিদপ্তর থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। এতে বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা নেতৃত্বসংকট কাটবে।
শিক্ষকদের মধ্যে কাজ করছে বাড়তি উদ্বেগ। রাজধানীর এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ১৩টি বছর আইনি লড়াইয়ের পেছনে নষ্ট হয়েছে। রায়ের পরেও পাঁচ মাস নথিপত্রের কারণে কাজ বন্ধ ছিল। ডিপিইর কাছে আমাদের আকুতি, যেন আর কোনো আমলাতান্ত্রিক অজুহাতে সময় নষ্ট না করা হয়। বিশেষ করে যেসব শিক্ষকের অবসরের সময় ঘনিয়ে এসেছে, তারা বড় ধরনের মানসিক চাপে রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক আক্ষেপ করে জানালেন, তার চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছর বাকি। এই সময়ের মধ্যে যদি জ্যেষ্ঠতা তালিকা চূড়ান্ত হয়ে পদোন্নতি না মেলে, তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পদোন্নতির স্বাদ পাওয়া তার আর সম্ভব হবে না। অবসর ঘনিয়ে আসা শিক্ষকেরা আছেন আরও বড় উদ্বেগে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের এই আইনি বিরোধ মূলত তৈরি হয়েছিল জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে। একই সঙ্গে দেশে তৈরি হবে নতুন নিয়োগের পথ।
২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। বেসরকারি চাকরিতে বেতন ‘আলোচনা সাপেক্ষে’, দর-কষাকষি কীভাবে করবেন চাকরিপ্রার্থীরা।
সে সময়কার বিধিমালার ৯(১) ধারা অনুযায়ী, জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির ৫০ শতাংশ সময় কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার নিয়ম ছিল, তবে তাদের অবস্থান রাখা হয়েছিল সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকদের নিচে।
এই শর্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে রিট হলেও আপিল বিভাগ সরকারের বিধিমালার পক্ষেই রায় দিয়েছেন। সেই রায় অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা সরাসরি নিয়োগ পেয়েছেন, তারা জ্যেষ্ঠতায় অগ্রাধিকার পাবেন। ২০১৩ বা তার পরের সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরিকালের অর্ধেক সময় বিবেচনায় নিয়ে জেলাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। বর্তমানে কোন অবস্থায় পদোন্নতিপ্রক্রিয়া। হাইকোর্ট সরকারের ওই শর্ত বাতিল করলেও আপিল বিভাগ পরে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারের বিধিমালার পক্ষেই রায় দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯৩ জনের চাকরি, আবেদন ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হবে। মোট ৩৬ হাজার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হবেন। এতে সৃষ্ট শূন্য পদ এবং আগে থেকে থাকা খালি পদ মিলে সহকারী শিক্ষকের প্রায় ৩৮ হাজার ৪৩৩টি পদ খালি হয়ে যাবে। যদিও সম্প্রতি ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ওরিয়েন্টেশন শেষে বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন, তবুও পদোন্নতি কার্যকর হওয়ামাত্রই বিপুল পরিমাণ সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়বে। এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে ডিপিইকে আবারও নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এত বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি পেয়ে অন্য পদে চলে গেলে তাঁদের ফেলে যাওয়া পদগুলো খালি হয়ে যাবে। এআই যুগে গণিত শেখা কি জরুরি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জেনে নিন।

























